চুল মানুষের সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল পড়তে শুরু করলে অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে একটি বিষয় জানা জরুরি যে, চুল ঝরা সব সময় রোগের লক্ষণ নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ চুল ঝরা শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন নতুন চুল আগের মতো গজায় না বা চুল পড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। চুল কেন ঝরে, কীভাবে ঝরে এবং এটি কমানোর উপায় কী—এসব বিষয় জানা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
চুল কীভাবে ঝরে?
প্রতিটি চুল মাথার ত্বকের নিচে থাকা একটি ক্ষুদ্র গঠন, যাকে হেয়ার ফলিকল (Hair Follicle) বলা হয়, সেখান থেকে জন্মায়। প্রতিটি ফলিকল একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র অনুসরণ করে। এই জীবনচক্র চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
প্রথম ধাপ হলো অ্যানাজেন (Anagen) বা বৃদ্ধি পর্যায়। এটি চুলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের ধাপ, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই সময়ে ফলিকলের কোষ দ্রুত বিভাজিত হয় এবং চুল ক্রমাগত লম্বা হতে থাকে।
দ্বিতীয় ধাপ হলো ক্যাটাজেন (Catagen) বা পরিবর্তন পর্যায়। এটি মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়। এ সময় চুলের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় এবং ফলিকল ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে।
তৃতীয় ধাপ হলো টেলোজেন (Telogen) বা বিশ্রাম পর্যায়। এই পর্যায়ে চুল প্রায় দুই থেকে চার মাস স্থির অবস্থায় থাকে। চুল তখন আর বাড়ে না, তবে মাথায় আটকে থাকে।
শেষ ধাপ হলো এক্সোজেন (Exogen) বা ঝরে পড়ার পর্যায়। নতুন চুল ফলিকলের ভেতর থেকে বের হতে শুরু করলে পুরনো চুল ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায় এবং আঁচড়ানোর সময়, গোসলের সময় বা স্বাভাবিকভাবেই পড়ে যায়। একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক বলে ধরা হয়।
চুল কেন ঝরে?
চুল ঝরার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো বংশগত প্রভাব। পরিবারের সদস্যদের অল্প বয়সে টাক পড়ার ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা দিতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত কপালের দুই পাশ থেকে শুরু হয়, আর নারীদের ক্ষেত্রে মাথার মাঝের অংশের চুল পাতলা হতে থাকে।
হরমোনের পরিবর্তন চুল ঝরার আরেকটি বড় কারণ। থাইরয়েডের সমস্যা, সন্তান জন্মের পর শরীরের হরমোনের পরিবর্তন অথবা নারীদের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)-এর কারণে চুল পড়তে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা শারীরিক ধকল চুল ঝরার একটি পরিচিত কারণ। বড় ধরনের জ্বর, অপারেশন, দুর্ঘটনা বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের দুই থেকে তিন মাস পরে অনেক সময় হঠাৎ করে প্রচুর চুল পড়তে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম (Telogen Effluvium) বলা হয়।
পুষ্টির ঘাটতিও চুল পড়ার অন্যতম কারণ। শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন ডি বা ভিটামিন বি-১২-এর অভাব হলে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহজেই ঝরে যায়।
এ ছাড়া স্ক্যাল্পের সমস্যা, যেমন খুশকি, ফাঙ্গাল সংক্রমণ বা সোরিয়াসিসের কারণে চুলের গোড়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার, চুলে ঘন ঘন রং করা, কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা খুব শক্ত করে চুল বাঁধার অভ্যাসও চুল ভেঙে যাওয়া ও ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
চুল ঝরা কমানোর উপায়
চুল সম্পূর্ণভাবে পড়া বন্ধ করা সব সময় সম্ভব না হলেও সঠিক যত্ন নিলে অস্বাভাবিক চুল পড়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, যেমন ডিম, মাছ, দুধ ও ডাল খাওয়া উপকারী। আয়রনসমৃদ্ধ খাবার হিসেবে পালং শাক, কলিজা ও ডাল খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চুলের জন্য মৃদু শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত এবং খুব গরম পানি দিয়ে মাথা ধোয়া এড়িয়ে চলা ভালো। ভেজা চুল জোরে আঁচড়ানো উচিত নয়, কারণ এতে চুল সহজেই ভেঙে যেতে পারে। খুশকি থাকলে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
যদি প্রতিদিন অস্বাভাবিক পরিমাণে চুল পড়ে, মাথার নির্দিষ্ট জায়গায় টাক দেখা দেয়, চুল পড়ার সঙ্গে চুলকানি বা লালচে ভাব থাকে অথবা তিন মাসের বেশি সময় ধরে অতিরিক্ত চুল পড়তে থাকে, তাহলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা করে আয়রন, থাইরয়েড বা ভিটামিনের ঘাটতি আছে কি না তা নির্ণয় করতে পারেন এবং মিনোক্সিডিল, ফিনাস্টেরাইড বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি পরামর্শ দিতে পারেন।
উপসংহার
চুল ঝরা একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া হলেও অতিরিক্ত চুল পড়া অবহেলা করা উচিত নয়। চুলের জীবনচক্র, পুষ্টি, হরমোন, মানসিক চাপ এবং সঠিক পরিচর্যার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই অযথা দুশ্চিন্তা না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব।
