বজরঙ্গি ভাইজান: ১৫টি অজানা তথ্য, বাস্তব ঘটনা, নির্মাণের গল্প ও বক্স অফিস ইতিহাস

বজরঙ্গি ভাইজান: ১৫টি অজানা তথ্য, বাস্তব ঘটনা, নির্মাণের গল্প ও বক্স অফিস ইতিহাস

বলিউডের ইতিহাসে এমন কিছু সিনেমা আছে, যেগুলো শুধু বক্স অফিসে সফল হয়নি, বরং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে। ২০১৫ সালের ১৭ জুলাই মুক্তি পাওয়া ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ সেই বিরল তালিকার অন্যতম। সালমান খান, হারশালি মালহোত্রা, কারিনা কাপুর এবং নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর অভিনয়ে নির্মিত এই সিনেমা প্রমাণ করেছিল—ভালো গল্প, শক্তিশালী আবেগ এবং মানবিক বার্তা থাকলে একটি চলচ্চিত্র ভাষা, ধর্ম কিংবা সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে।

কবির খান পরিচালিত এই সিনেমাটি একদিকে যেমন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখিয়েছে, অন্যদিকে মানবিকতার এমন এক গল্প তুলে ধরেছে, যা আজও কোটি দর্শককে আবেগাপ্লুত করে। মুক্তির প্রায় এক দশক পরেও ‘মুন্নি’ আর ‘পবন’-এর যাত্রা নতুন দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়।

বজরঙ্গি ভাইজান সিনেমা

ছবির উৎস: Internet

তবে এই সিনেমার পর্দার পেছনের গল্প আরও বেশি চমকপ্রদ। চরিত্র নির্বাচন থেকে শুরু করে বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণা, শুটিংয়ের কঠিন অভিজ্ঞতা, আইনি জটিলতা, বক্স অফিস রেকর্ড—সব মিলিয়ে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর ইতিহাস নিজেই যেন আরেকটি সিনেমা। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই কালজয়ী চলচ্চিত্রের ১৫টি অজানা তথ্য।

১. সালমান খান ছিলেন না প্রথম পছন্দ

আজ ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ বললেই সবার চোখে ভেসে ওঠে সালমান খানের হাসিমাখা মুখ। কিন্তু শুরুতে পরিচালক ও প্রযোজকদের প্রথম পছন্দ তিনি ছিলেন না। প্রযোজক রকলাইন ভেঙ্কাটেশ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই গল্প নিয়ে বিভিন্ন অভিনেতার কাছে ঘুরেছেন।

প্রথমে তামিল সুপারস্টার রজনীকান্তের সঙ্গে আলোচনা হয়। এরপর আল্লু অর্জুন, পুনিত রাজকুমার এবং আমির খানের কাছেও স্ক্রিপ্ট পৌঁছায়। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কারণে সিনেমাটি করতে পারেননি।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমির খান নিজেই সালমান খানের নাম প্রস্তাব করেন। পরে সালমান গল্প শুনে বুঝতে পারেন এটি সাধারণ অ্যাকশন সিনেমা নয়। তিনি কোনো পরিবর্তনের শর্ত না দিয়েই সিনেমাটিতে অভিনয় করতে সম্মতি দেন।

আজ অনেকে মনে করেন, যদি অন্য কেউ এই চরিত্রে অভিনয় করতেন, তাহলে হয়তো সিনেমাটি একই আবেগ তৈরি করতে পারত না।

২. বাস্তব জীবনের ‘গীতা’ থেকে অনুপ্রাণিত মুন্নি

সিনেমার সবচেয়ে আবেগঘন অংশ হলো পাকিস্তানি ছোট্ট মেয়ে মুন্নির গল্প। অনেকেই ভাবেন এটি পুরোপুরি কাল্পনিক, কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে মিল রয়েছে ‘গীতা’ নামের এক ভারতীয় তরুণীর জীবনের।

গীতা বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। ছোটবেলায় ভুলবশত পাকিস্তানে চলে যান এবং বহু বছর সেখানে আটকে ছিলেন। পরে মানবাধিকারকর্মী আনসার বার্নির উদ্যোগে তিনি পরিবারের কাছে ফিরে আসেন।

যদিও সিনেমার গল্প সরাসরি সেই ঘটনাকে অনুসরণ করেনি, তবু নির্মাতারা এই বাস্তব ঘটনাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

Salman khan


৩. চাঁদ নবাব চরিত্রটি সত্যিকারের সাংবাদিক

নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর অভিনীত চাঁদ নবাব চরিত্রটি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় অংশ। করাচি রেলস্টেশনে রিপোর্ট করতে গিয়ে যাত্রীদের ভিড়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্যটি বাস্তব একজন সাংবাদিকের ভিডিও থেকে নেওয়া হয়।

চাঁদ নবাবের সেই ভিডিও ইউটিউবে ভাইরাল হয়েছিল। পরিচালক কবির খান সেটি দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে বাস্তব চরিত্রটিকেই সিনেমায় নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।

এই চরিত্রটি শুধু হাসির খোরাক নয়; বরং সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ আবেগঘন মুহূর্তগুলোর অন্যতম চালিকাশক্তি।


Imran Hasmi

৪. ইমরান হাশমি না করায় সুযোগ পান নওয়াজ

চাঁদ নবাব চরিত্রে প্রথমে ইমরান হাশমির সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন চরিত্রটির স্ক্রিনটাইম কম। পরে সালমান খানের পরামর্শে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীকে নেওয়া হয়।

আজ এই সিদ্ধান্তকে বলিউডের অন্যতম সেরা কাস্টিং সিদ্ধান্ত বলা হয়। কারণ নওয়াজ তার অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রটিকে বাস্তবের থেকেও বেশি জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

৫. মুন্নিকে খুঁজতে হাজারের বেশি অডিশন

মুন্নি চরিত্রের জন্য পরিচালক কোনো আপস করতে চাননি। ভারতের বিভিন্ন শহরে অডিশন নেওয়ার পাশাপাশি ইরান ও আফগানিস্তানেও শিশুশিল্পী খোঁজা হয়।

শেষ পর্যন্ত দিল্লির ছোট্ট হারশালি মালহোত্রাকে নির্বাচিত করা হয়।

মজার বিষয় হলো, পুরো সিনেমায় তার খুব কম সংলাপ রয়েছে। কিন্তু শুধু চোখের ভাষা, হাসি এবং কান্নার মাধ্যমে তিনি কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন।


মুন্নি চরিত্রে হারশালি মালহোত্রা

৬. ক্লাইম্যাক্স শুটিং ছিল সবচেয়ে কঠিন

সিনেমার শেষ দৃশ্য—যেখানে মুন্নি ‘মামা’ বলে চিৎকার করে—বলিউড ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত। এই দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায়। সেখানে তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। অক্সিজেনের স্বল্পতা, তীব্র ঠান্ডা এবং কঠিন পরিবেশে শুটিং করা পুরো ইউনিটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।


৭. সিনেমার নাম নিয়ে সাতটি মামলা

‘বজরঙ্গি ভাইজান’ নাম ঘোষণার পর কয়েকটি সংগঠন আপত্তি তোলে। পরিচালক কবির খানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। অনেকে দাবি করেছিলেন, ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে সিনেমার নাম রাখা উচিত নয়। সব আইনি জটিলতা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত নামেই সিনেমাটি মুক্তি পায়।


৮. ‘তু জো মিলা’ গানটি রেকর্ড হয়েছিল সিডনিতে

সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘তু জো মিলা’ গেয়েছিলেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী কেকে। গানটির রেকর্ডিং হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। কেকে ও প্রীতমের এই জুটি আবারও কোটি মানুষের হৃদয়ে নস্টালজিয়া ফিরিয়ে এনেছিল।


৯. সালমানের ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়?

অনেক সমালোচক মনে করেন, এটি সালমান খানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিণত অভিনয়। এখানে তিনি কোনো অতিমানবীয় নায়ক নন; বরং একজন সাধারণ মানুষ, যিনি নিজের বিশ্বাস আর মানবিকতার জন্য অসম্ভব এক যাত্রায় বের হন।

তবুও সে বছর ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাননি তিনি।


১০. বাহুবলির সঙ্গে অবাক করা সম্পর্ক

২০১৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত দুটি ভারতীয় সিনেমা ছিল ‘বাহুবলি’ এবং ‘বজরঙ্গি ভাইজান’। দুটি সিনেমার গল্প লিখেছিলেন একই ব্যক্তি—বিজয়েন্দ্র প্রসাদ। তিনি পরিচালক এস. এস. রাজামৌলির বাবা এবং ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সফল চিত্রনাট্যকার।


Hrittik Roshan

১১. হৃতিক রোশনের হাত থেকেও ফসকে যায় সিনেমাটি

শুরুর দিকে পরিচালক রাকেশ রোশন এই গল্প নিয়ে ছেলে হৃতিক রোশনকে অভিনয় করানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু প্রযোজনা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে সালমানের হাতে গিয়ে সিনেমাটি ইতিহাস তৈরি করে।

১২. কারিনা কাপুর কেন রাজি হয়েছিলেন?

কারিনা কাপুরের চরিত্রটি খুব বড় না হলেও তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই কাজটি করেছিলেন। কারণ এর আগে সালমানের সঙ্গে ‘বডিগার্ড’, ‘কিঁও কি’ এবং ‘ম্যায় অর মিসেস খান্না’-এর মতো সফল সিনেমায় কাজ করেছিলেন।


সালমান ও কারিনা

ছবির উৎস: Internet

১৩. কবির খান ও সালমানের সফল জুটি

সালমান ও কবির খান একসঙ্গে তিনটি সিনেমায় কাজ করেছেন। ‘এক থা টাইগার’ ও ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ ব্লকবাস্টার হলেও ‘টিউবলাইট’ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে দর্শকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় সহযোগিতা আজও ‘বজরঙ্গি ভাইজান’।


১৪. টানা হিট সিনেমার রেকর্ড

এই সিনেমা মুক্তির সময় সালমান টানা একাধিক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন। ‘দাবাং’, ‘রেডি’, ‘বডিগার্ড’, ‘এক থা টাইগার’, ‘কিক’, ‘প্রেম রতন ধন পায়ো’—সব মিলিয়ে তার হিটের ধারাবাহিকতা বলিউডে নতুন রেকর্ড গড়েছিল।


১৫. বক্স অফিসে ইতিহাস

প্রায় ১২৫ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯১০ কোটি রুপি আয় করে। এটি প্রথম ভারতীয় সিনেমাগুলোর একটি, যা মাত্র তিন দিনে ১০০ কোটির ঘরে পৌঁছেছিল। এছাড়া সিনেমাটি ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পুরস্কারে মনোনয়ন পেয়ে ৩০টির বেশি বিভাগে পুরস্কার জিতে নেয়।


বজরঙ্গি ভাইজান

ছবির উৎস: Internet

প্রায় এক দশক পরও ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ শুধু একটি সফল সিনেমা নয়; বরং এটি এমন এক চলচ্চিত্র, যা প্রমাণ করেছে—মানুষের প্রতি ভালোবাসা ধর্ম, রাজনীতি কিংবা সীমান্তের চেয়ে বড় হতে পারে। মুন্নির নিষ্পাপ হাসি, পবনের নিঃস্বার্থ সাহস এবং চাঁদ নবাবের প্রাণবন্ত উপস্থিতি মিলিয়ে এটি বলিউড ইতিহাসের অন্যতম সেরা মানবিক চলচ্চিত্র হিসেবে আজও দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে আছে।

#MetroLife #বজরঙ্গি #ভাইজান

Share

মতামতসমূহ