বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আরেকটি গৌরবময় অধ্যায় যুক্ত করল আদনান আল রাজীব পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আলী’। ভারতের ১৬তম বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (Bengaluru International Short Film Festival – BISFF)-এ ‘এশিয়ান আই কম্পিটিশন’ বিভাগে সেরা চলচ্চিত্র (Best Film) পুরস্কার জিতে নিয়েছে এই চলচ্চিত্র। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক স্বীকৃতি পাওয়া ‘আলী’র জন্য এটি শুধু আরেকটি ট্রফি নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মাত্র ১৫ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করেছে, শক্তিশালী গল্প, নির্মাণশৈলী এবং মানবিক বার্তা থাকলে ভাষা ও দেশের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বজুড়ে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছানো সম্ভব।
বেঙ্গালুরু উৎসবে বাংলাদেশের বড় জয়
ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (BISFF)-এর ১৬তম আসরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেরা হয়েছে ‘আলী’। ‘এশিয়ান আই কম্পিটিশন’ বিভাগে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক জুরিদের প্রশংসা অর্জন করেছে।
উৎসব শেষে চলচ্চিত্রটির প্রযোজক তানভীর হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুখবরটি জানান। তিনি লেখেন, “অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ‘এশিয়ান আই প্রতিযোগিতা’ বিভাগে বিজয়ী হয়েছে ‘আলী’।” একই পোস্টে তিনি উৎসবের আয়োজক, জুরি সদস্য হরিশ মাল্যা, রজত গোস্বামী এবং সেন্থিল কুমার-সহ পুরো টিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরিচালক আদনান আল রাজীবও মন্তব্যে নিজের আনন্দ প্রকাশ করেন, যা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলে।

‘আলী’: একটি সাহসী গল্পের নাম
‘আলী’ কেবল একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নয়; এটি ব্যক্তি স্বাধীনতা, পরিচয় এবং সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের গল্প।
চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের একটি উপকূলীয় জনপদ, যেখানে সমাজের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নারীদের গান গাওয়া নিষিদ্ধ। এই রক্ষণশীল বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে ওঠা কিশোর আলী একটি গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শহরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তাকে শুধু সমাজের রীতিনীতির সঙ্গেই নয়, নিজের ভেতরের এক গভীর সংকটের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়। চলচ্চিত্রটিতে আলীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন আল-আমিন, আর তার মায়ের চরিত্রে রয়েছেন ইন্দ্রাণী সোমা। খুব কম সংলাপ, নিখুঁত অভিনয় এবং শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল ভাষার মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে
কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকেই শুরু হয়েছিল ইতিহাস
‘আলী’র আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালে, যখন এটি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব কান চলচ্চিত্র উৎসবের (Festival de Cannes) অফিসিয়াল শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা কানের অফিসিয়াল শর্ট ফিল্ম কম্পিটিশনে জায়গা করে নেয়। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রটি Short Film Special Mention অর্জন করে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার বেঙ্গালুরুতে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন ‘আলী’র আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আরও দৃঢ় করেছে।

কেন বিশ্বজুড়ে আলোচনায় ‘আলী’?
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, ‘আলী’র সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রতীকী গল্প বলার ধরণ। বাহ্যিকভাবে এটি একটি কিশোরের গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার গল্প হলেও, গভীরে এটি পরিচয়, স্বাধীনতা এবং সমাজের চাপের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে।
বিশেষ করে চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত প্রতীক, সাউন্ড ডিজাইন, দীর্ঘ শট এবং নীরবতার ব্যবহার আন্তর্জাতিক সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেক সমালোচক মনে করেন, এটি শুধু বাংলাদেশের গল্প নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের সংকটের একটি সার্বজনীন রূপক।
বাংলাদেশের সঙ্গে ফিলিপাইনের যৌথ প্রযোজনা
‘আলী’ একটি বাংলাদেশ-ফিলিপাইন যৌথ প্রযোজনা। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন আদনান আল রাজীব এবং প্রযোজনা করেছেন তানভীর হোসেন ও ক্রিস্টিন ডি লিয়ন। চিত্রনাট্য লিখেছেন আরভিন বেলারমিনো এবং কাইলা রোমেরো।চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন কামরুল হাসান খসরু, সম্পাদনা করেছেন তাইফুল চৌধুরী স্বাধীন, আর সাউন্ড ডিজাইনের দায়িত্বে ছিলেন বিয়েন স্পার্কস। বাংলাদেশের পাশাপাশি ফিলিপাইনে পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি উৎকর্ষ লাভ করেছে।
বিশ্বজুড়ে উৎসব থেকে উৎসবে
কান এবং বেঙ্গালুরুতেই ‘আলী’র সাফল্য থেমে থাকেনি। চলচ্চিত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং একাধিক পুরস্কারও অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
কান চলচ্চিত্র উৎসব (ফ্রান্স) – Special Mention
কিয়েভ আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল – Special Mention
কাঠমান্ডু আন্তর্জাতিক মাউন্টেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল – Best Short Fiction
বালি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব – Best Short Narrative
বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল – Asian Eye Competition Best Film
এছাড়াও চলচ্চিত্রটি টরন্টো, মেলবোর্ন, সাংহাই, মুম্বাই, পাম স্প্রিংস, রেইনড্যান্সসহ বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে।
আদনান আল রাজীবের আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্ত হলো
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত নির্মাতা আদনান আল রাজীব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। ‘প্রিয় মালতী’-এর মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পর ‘আলী’ তাকে বৈশ্বিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। তিনি কানের অফিসিয়াল শর্ট ফিল্ম কম্পিটিশনে নির্বাচিত হওয়া প্রথম বাংলাদেশি নির্মাতা হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বেঙ্গালুরুর এই বিজয় তার আন্তর্জাতিক সাফল্যের তালিকায় নতুন সংযোজন।
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বাজেট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। ‘আলী’র ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সাফল্য প্রমাণ করেছে, শক্তিশালী গল্প, সৃজনশীল নির্মাণ এবং আন্তরিক উপস্থাপনাই বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই অর্জন নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। কারণ এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতা ও সংস্কৃতির গল্পও আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘আলী’র বিজয় তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাণের সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কানের ইতিহাস গড়ার পর বেঙ্গালুরুতে সেরা চলচ্চিত্রের মুকুট জয় করে ‘আলী’ প্রমাণ করেছে, বাংলা ভাষার গল্পও বিশ্ব সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
#MetroLife
